স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড আউটলুক

বৈশ্বিক সংকটে সংস্কার ও রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানোই মূল চ্যালেঞ্জ

বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিপর্যয় এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতির চাপে বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত বা ‘ইকোনমিক স্কারিং’-এর ঝুঁকি বাড়ছে।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সাহসী সংস্কার, অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

গত ২১ এপ্রিল রাজধানীর গুলশানে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের (এসসিবি) প্রধান কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল অ্যান্ড বাংলাদেশ আউটলুক: এইচ১ ২০২৬’ শীর্ষক এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব পর্যবেক্ষণ তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের গ্লোবাল হেড অব রিসার্চ ও চিফ স্ট্র্যাটেজিস্ট এরিক রবার্টসন। দেশের প্রেক্ষাপট ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে কথা বলেন স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশের সিইও নাসের এজাজ বিজয়।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট নিয়ে এরিক রবার্টসন তার বক্তব্যে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিসহ বৈশ্বিক গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোয় চলমান অস্থিরতা নিয়ে আর্থিক বাজার যতটা আশাবাদী, বাস্তব পরিস্থিতি ততটা সহজ নয়। পণ্য সরবরাহ স্বাভাবিক হতে প্রত্যাশার চেয়েও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।’ তিনি সতর্ক করে বলেন, বিশ্ব এখন ‘রিসোর্স ন্যাশনালিজম’ বা সম্পদ নিয়ে জাতীয়তাবাদের যুগে প্রবেশ করেছে। খনিজ বা জ্বালানিসমৃদ্ধ দেশগুলো এখন তাদের একচেটিয়া আধিপত্যকে ভূরাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার বহুমুখীকরণ করতে গিয়ে দেশগুলোর ব্যয় আরো বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম উচ্চপর্যায়ে থাকার ঝুঁকি তৈরি হবে।

রবার্টসনের মতে, বিশ্বজুড়ে এখন ‘স্ট্যাগফ্লেশন’ (উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও নিম্ন প্রবৃদ্ধি) পরিস্থিতির আশঙ্কা বাড়ছে। এটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য বড় এক নীতিনির্ধারণী উভয় সংকট তৈরি করেছে। তিনি বলেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতি মূলত সরবরাহজনিত ধাক্কা বা ‘সাপ্লাই শক’। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে তেলের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে খেয়াল রাখতে হবে যেন মূল্যস্ফীতি দমনের অতি-প্রচেষ্টায় প্রবৃদ্ধির গতি থমকে না যায়। প্রবৃদ্ধির এ ক্ষতি সামলে ওঠা পরে কঠিন হতে পারে।

দেশের অর্থনীতি নিয়ে নাসের এজাজ বিজয় বলেন, কভিড ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের রেশ না কাটতেই নতুন বৈশ্বিক সংকট বাংলাদেশের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৭ বছর পর নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় উত্তরণ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতা—সব মিলিয়ে সরকার এখন একটি লার্নিং কার্ভের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, আমাদের প্রধান দুর্বলতা হলো অত্যন্ত নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত এবং সীমিত আর্থিক সক্ষমতা। সংকটের কোনো শর্টকাট বা জাদুকরী সমাধান নেই। এ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকার এবং জনগণ—সব পক্ষকেই সম্মিলিতভাবে কিছুটা ‘ব্যথা’ বা ত্যাগ স্বীকারের মানসিকতা রাখতে হবে।

জ্বালানি পরিস্থিতির ওপর গুরুত্ব দিয়ে এসসিবি সিইও বলেন, শিল্পের চাকা সচল রাখতে খরচের চেয়েও জ্বালানির ‘নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ’ নিশ্চিত করা বেশি জরুরি। সরবরাহ ঠিক না থাকলে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় বহু গুণ বেড়ে যায়। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের চাহিদার প্রায় ৫৫-৬০ শতাংশ গ্যাস স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হয়, যা সংকটের সময়ে বড় একটি শক্তি। তবে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে আমদানীকৃত জ্বালানির ব্যয় মেটাতে অতিরিক্ত অর্থায়ন বা বিশেষ সুবিধার জন্য এডিবি, বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের মতো সংস্থার সঙ্গে সরকারের আলোচনা ফলপ্রসূ হওয়া জরুরি।

রফতানি প্রসঙ্গে তিনি জানান, বৈশ্বিক চাহিদা সংকুচিত হওয়ায় রফতানি আদেশে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বড় উদ্যোক্তারা কমপ্লায়েন্স ও টেকসই সক্ষমতার কারণে টিকে থাকলেও ছোট রফতানিকারকরা চ্যালেঞ্জের মুখে। তবে এটি মহাবিপর্যয়কর কোনো পরিস্থিতি নয়। ব্যাংক খাত নিয়ে তিনি বলেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি মূলত পুরনো অস্থিতিশীলতার বহিঃপ্রকাশ, যা এখন ব্যালান্স শিটে স্বীকৃত হচ্ছে। পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করা এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া তারল্য সংকট ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানো সম্ভব নয়।

বাণিজ্য অর্থায়নে নিজেদের সক্ষমতা তুলে ধরে নাসের এজাজ বিজয় বলেন, আমাদের ক্যাপিটাল রেশিও বর্তমানে ৪০ শতাংশ, যা বাজারের গড়ের চেয়ে অনেক বেশি। গত কয়েক বছর আমরা লভ্যাংশ বিদেশে না পাঠিয়ে স্থানীয় গ্রাহকদের এলসি সেটলমেন্ট ও ব্যবসায়িক প্রয়োজনে পাশে দাঁড়িয়েছি। ফলে আমাদের তারল্য পরিস্থিতি অত্যন্ত স্থিতিশীল।

ব্রিফিংয়ের শেষে বলা হয়, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে বাংলাদেশের জন্য তিনটি প্রধান কাজ হবে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার এবং প্রশাসনিক সুশাসন নিশ্চিত করা। সরকারের পক্ষ থেকে নীতিমালার ধারাবাহিকতা এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে স্বচ্ছ বার্তা পৌঁছানো গেলে বর্তমান প্রতিকূলতা কাটিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

আরও